প্রকাশিত: ১৮ মে, ২০২৪, ১২:১৮ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
ম্যাঙ্গিফেরা ইন্ডিকা (Mangifera indica), নামটি হয়তো অনেকেরই অজানা, তবে এটি বহুল পরিচিত ও অন্যতম জনবহুল সর্বাধিক আবাদকৃত ফল হিসেবে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। পাকিস্তান, ভারত আর ফিলিপাইনের জাতীয় ফল আম। আর বাংলাদেশের জাতীয় বৃক্ষ হলো আম গাছ।
কয়েকদিন হলো বাজারে পাকা আম আসতে শুরু করেছে। সারা পৃথিবীতে আম ফল হিসেবে খুবই জনপ্রিয়, এরকম পছন্দের ফল পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই। এমন কোনো জাতি নেই যারা আম পছন্দ করে না। তাই একে সন্মান দিয়ে ʼফলের রাজাʼ বলা হয়।
পৃথিবীতে প্রায় ৩৫ প্রজাতির আম আছে। আমের প্রায় কয়েকশ জাত রয়েছে। যেমন: ফজলি, ল্যাংড়া, গোপালভোগ, খিরসাপাত, অরুনা, আম্রপালি, মল্লিকা, সুবর্নরেখা, মিশ্রিদানা, নিলাম্বরী, কালীভোগ, কাঁচামিঠা, বারোমাসি ইত্যাদি।
আমের পুষ্টিগুণ
গ্রীষ্মকালের সুমিষ্ট ফল আম শুধু আমাদের স্বাদে তৃপ্তিই জোগায় না, পুষ্টিরও জোগান দেয়। পাকা আমে প্রোটিনের মাত্রা বেশি। প্রতি ১০০ গ্রাম আমে দুই হাজার ৭৪০ মাইক্রোগ্রাম ক্যারোটিন থাকে। এতে ১.৩ গ্রাম আয়রন, ১৪ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ১৬ মিলিগ্রাম ফসফরাস, ১৬ মিলিগ্রাম ভিটামিন ‘সি’, ০.৯ মিলিগ্রাম রিভোফ্লেভিন এবং ০.০৮ মিলিগ্রাম থায়ামিন থাকে।
এতে আছে প্রচুর খনিজ লবণ এবং বিভিন্ন ভিটামিন। প্রতি ১০০ গ্রাম পাকা আমে ০.৫ গ্রাম খনিজ লবণ থাকে। এ ছাড়া ভিটামিন ‘এ’, ভিটামিন ‘সি’ ও ভিটামিন বি৬ রয়েছে আমে। এতে আছে অ্যামাইনো এসিড, পটাসিয়াম ও কপার।
আমে থাকা বিটা ক্যারোটিন, লুশিয়েন জিলাইক এসিড, আলফা ক্যারোটিন, পলি পিথানল কিউরেচিন কাম্ফারল, ক্যাফিক এসিড ইত্যাদিও স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। এতে কিছু পরিমাণ প্রোটিন ও ফ্যাট থাকে। যেমন—প্রতি ১০০ গ্রাম পাকা আমে ১ গ্রাম প্রোটিন এবং ০.৭ গ্রাম ফ্যাট থাকে। আম শ্বেতসারের ভালো উৎস। প্রতি ১০০ গ্রাম পাকা আমে ২০ গ্রাম শ্বেতসার পাওয়া যায়।
উপকারিতা
ওজন কমাতে সাহায্য করে :
যারা ওজন কমাতে বা শরীরের বাড়তি ক্যালরি খরচ করতে চায়, তাদের জন্য আদর্শ ফল কাঁচা আম। পাকা মিষ্টি আমের চেয়ে কাঁচা আমে চিনি কম থাকে বলে এটি ক্যালরি খরচে সহায়তা করে।
যকৃতের সমস্যা দূর করে :
যকৃতের রোগ নিরাময়ের প্রাকৃতিক বন্ধু কাঁচা আম। কয়েক টুকরা কাঁচা আম চিবানো হলে পিত্তরস বৃদ্ধি পায়।
এতে যকৃতের স্বাস্থ্য ভালো হয় এবং অন্ত্রের জীবাণু সংক্রমণ দূর হয়।
শরীর ঠাণ্ডা থাকে :
কাঁচা আমে পটাসিয়াম থাকার কারণে তা শরীর ঠাণ্ডা রাখতে সাহায্য করে। এ কারণে শরীরে ঘাম কম হয়। গরমে ক্লান্তিও দূর হয়। তা ছাড়া কাঁচা আম সান স্ট্রোক থেকেও রক্ষা করে।
এসিডিটির সমস্যার সমাধানে :
আমে রয়েছে টারটারিক এসিড, ম্যালিক এসিড এবং অল্প পরিমাণে সাইট্রিক এসিড। এই এসিডিক উপাদানগুলো অ্যালকালাইজিংয়ের মাধ্যমে এসিডিটির সমস্যাকে প্রশমিত করতে কাজ করে।
হৃদরোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে :
বর্তমানে অন্যতম ভীতির কারণ হৃদরোগ। আম এই রোগ প্রতিরোধে খুব উপকারী। কারণ এতে আছে প্রচুর বিটা ক্যারোটিন। এটি ভিটামিন ‘এ’র উৎস। আম খেলে হৃদরোগ, ভুলে যাওয়ার সমস্যা, আর্থ্রাইটিসের মতো রোগ দূরে থাকে।
চোখের জন্য উপকারী :
পর্যাপ্ত পরিমাণ ভিটামিন ‘এ’র উপস্থিতি রয়েছে সুমিষ্ট এই ফলে। বড় একটি পাকা আমের এক পাশের অংশ থেকেই পাওয়া যাবে সারা দিনের প্রয়োজনীয় ২৫ শতাংশ ভিটামিন ‘এ’। ড্রাই আইয়ের সমস্যা কমাতেও পাকা আম উপকারী।
ত্বক ও চুলের জন্য উপকারী :
আমে থাকা উচ্চমাত্রার ভিটামিন ‘সি’ ত্বকের সুস্থতার জন্য খুবই জরুরি। প্রয়োজনীয় এই ভিটামিন ত্বকের কোলাজেন তৈরিকে ত্বরান্বিত করে, যা ত্বকের বয়সের ছাপ পড়ার সমস্যাকে রোধ করে। এ ছাড়া আমে থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট চুলের ফলিকলকে অক্সিডেটিভ ড্যামেজ থেকে রক্ষা করে, যার ফলে চুল পড়ার হার কমে।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে আম :
আমে থাকা ভিটামিন ‘সি’, ‘এ’ এবং অন্যান্য ২৫ ধরনের ক্যারোটেনয়েডস খুব সহজেই শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে কাজ করবে। রোগ প্রতিরোধের পাশাপাশি ইনফেকশনের সমস্যা কমাতেও সমানভাবে অবদান রাখবে ফলটি।
মিনারেলের ঘাটতি দূর করে আম :
শরীরে মিনারেলের ঘাটতি দেখা দিলে বিভিন্ন অসুখ বাসা বাঁধতে পারে। আম খেলে এই ঘাটতি অনেকটাই পূরণ হয়। কারণ আমে আছে প্রচুর পটাসিয়াম। শরীর থেকে বের হয়ে যাওয়া প্রয়োজনীয় লবণের ঘাটতিও পূরণ করে আম।
স্মৃতিশক্তি বাড়ায় :
শিশুকে আম খেতে দেওয়া উচিত। কারণ এটি স্মৃতিশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। আমে আছে গ্লুটামিক, ফলিক এসিড, যা মস্তিষ্কের কোষ উজ্জীবিত করে। মনোযোগ বৃদ্ধি পায়। তাই মস্তিষ্কের চাপ কমাতে আম খাওয়া যেতে পারে।
ঠাণ্ডার সমস্যা দূর করে :
ঠাণ্ডাজনিত সমস্যা দূর করতে আমের ভূমিকা অতুলনীয়। আমে আছে প্রচুর ভিটামিন ‘এ’ ও ‘ডি’। এই দুই ভিটামিন ঠাণ্ডাজনিত সমস্যা দ্রুত উপশম করে। তাই ঠাণ্ডা বা ফ্লু দেখা দিলে আম খাওয়া যেতে পারে।
স্কার্ভি প্রতিরোধ করে আম :
আম থেকে ভিটামিন ‘সি’ পাওয়া যায়। স্কার্ভি রোগ প্রতিরোধ করে এটি। দাঁত, মাড়ি, ত্বক ও হাড়ের সুস্থতা রক্ষা করতেও সাহায্য করে ভিটামিন ‘সি’।
হজমে সহায়ক :
অনেকেই হজমের নানা সমস্যায় ভুগে থাকে। বিশেষ করে যাদের আইবিএস আছে। সেসব সমস্যা থেকেও মুক্তি পেতে সাহায্য করতে পারে আম। এই ফলে আছে প্রচুর আঁশ। তাই আম খেলে হজমপ্রক্রিয়া উন্নত হয়। কোষ্ঠকাঠিন্য তাড়াতেও আম সমান উপকারী।
কিছু সতর্কতা
আম উপকারী ফল হলেও এটি একসঙ্গে খুব বেশি খাওয়া ঠিক নয়। কারণ পাকা আমে চিনির পরিমাণ বেশি থাকে। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে বেশি আম খাওয়া ক্ষতিকর। যাদের ডায়াবেটিস আছে, তাদের আম খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। একটি মাঝারি আমে ৩ গ্রাম ফাইবার থাকে। তাই একসঙ্গে বেশি আম খেলে বদহজম বা ডায়রিয়া হওয়ার ভয় থাকে। তা ছাড়া অতিরিক্ত পরিমাণে কাঁচা আম খেলে তাতেও ডায়রিয়া হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কাঁচা আমের কষ মুখে লাগলে ও পেটে গেলে মুখ, গলা ও পেটে সংক্রমণ হতে পারে। এ ছাড়া আমে থাকা ইউরিশিয়াল নামের রাসায়নিক অনেকের শরীরেই অ্যালার্জির সমস্যা সৃষ্টি করে। এর ফলে চর্মরোগ দেখা দেয়। এই রাসায়নিকের ফলে ত্বকের সমস্যা, যেমন—ত্বক ফুলে ওঠা, ফোসকা ও চুলকানি হতে পারে। আমের মৌসুমে আম খাবেন না তাতো হয় না। তাই শরীরের কথা চিন্তা করে আম খাওয়ার সময় অবশ্যই সতর্কতা অবলম্বন করুন।
মন্তব্য করুন