প্রকাশিত: ১৯ মে, ২০২৪, ০২:৩২ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
সোনাজয়ী ক্রীড়াবিদকে ধর্ষণ ও গর্ভপাতের ঘটনায় অভিযুক্ত বাংলাদেশ জুজুৎসু অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম নিউটনসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। রাজধানীর শাহ আলী ও মিরপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
শনিবার র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার আরাফাত ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতরা ধর্ষণের সাথে তাদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে তথ্য প্রদান করেছে বলে র্যাব জানায়। এদিকে, খেলোয়াড়দের ধর্ষণ ও গর্ভপাতের অভিযোগে অভিযুক্ত নিউটনের শাস্তি চায় মানবাধিকার কমিশন।
কমান্ডার আরাফাত ইসলাম, বহুল আলোচিত একজন নারী জুজুৎসু ক্রীড়াবিদকে ধর্ষণের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে বারবার ধর্ষণের ঘটনায় প্রধান আসামি বাংলাদেশ জুজুৎসু অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম নিউটনসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব।
সম্প্রতি জুজুৎসু অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম নিউটনের বিরুদ্ধে সোনাজয়ী ক্রীড়াবিদসহ একাধিক নারী খেলোয়াড়কে ধর্ষণ ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। তাদের মধ্যে একজন অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর বিষয়টি জানাজানি হয়। অভিযোগ আছে, এক পর্যায়ে গর্ভপাতও করানো হয় তার। এসব কাজে নিউটনকে সহযোগিতার অভিযোগ উঠেছে সুমাইয়া আক্তার নামের জুজুৎসুর আরেক নারী খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধে।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, গ্রেপ্তারকৃত রফিকুল ইসলাম ওরফে নিউটন একজন জুজুৎসু খেলার প্রশিক্ষক। পাশাপাশি সে রাজধানীর শ্যামলীতে অবস্থিত বাংলাদেশ জুজুৎসু এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। উক্ত এসোসিয়শনের অধিকাংশ প্রশিক্ষণার্থী নারী। যেখানে অভিভাবক হিসেবে এই কোমলমতি মেয়েদেরকে এগিযে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করার কথা ছিল। কিন্তু সেই ব্যক্তি কোমলমতি মেয়েদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তার হীন চরিত্র চরিতার্থ করার প্রয়াস চালায়। গ্রেপ্তারকৃত রফিকুল এসোসিয়েশনের সাধারন সম্পাদকের মত পদে থেকে প্রশিক্ষণার্থীদের ভালো অবস্থানে নিয়ে যাওয়া এবং বিদেশ ভ্রমণের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ ও শারীরিক নির্যাতনের মতো অপকর্ম করতো বলে জানা যায়। এছাড়াও সে এসোসিয়েশনের অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে খেলোয়ারদের সাথে অনৈতিক কার্যকলাপের কারণে গর্ভবতী হলে তাদের গর্ভপাত করানোর মতো ভয়ংকর কাজও করেছে বলে জানা যায়। এমনকি সে অনুশীলনের আগে মেয়েদের পোশাক পরিবর্তনের কক্ষে প্রবেশ করে তাদের জোরপূর্বক ধর্ষণ করে ভিডিও ধারণ ও নগ্ন ছবি তুলে রাখতো। পরবর্তীতে ধারণকৃত নগ্ন ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় ভীতি দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে বারংবার ধর্ষণ করে তার হীন চরিত্র চরিতার্থ করতো বলে জানা যায়।
মামলার এজাহার সূত্রে আরও জানা যায় গ্রেপ্তারকৃত রফিক এসোসিয়েশনের গ্রেপ্তারকৃত অপর এক নারী খেলোয়াড় এর সহায়তায় অন্য নারী খেলোয়াড়দের মিথ্যা প্রলোভন ও ভয়ভীতি দেখিয়ে যৌন হয়রানি সহ জোর পূর্বক শারীরিক সম্পর্ক করতো। ভিকটিম বিগত দুই বছর যাবত উক্ত জুজুৎসু এসোসিয়েশনে গ্রেপ্তারকৃত রফিকের অধীনে জুজুৎসু খেলার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে আসছিলো। খেলার প্রশিক্ষণকালীন সময়ে গ্রেপ্তারকৃত রফিক বিভিন্ন অজুহাতে ভিকটিমকে শারীরিকভাবে হেনস্তা করতো। পরবর্তীতে ভিকটিম প্র্যাকটিস শেষে চেঞ্জিং রুমে পোষাক পরিবর্তন করার সময় গ্রেপ্তারকৃত নারী খেলোয়াড় ভিকটিমকে রুমের মধ্যে আটকে রেখে গ্রেপ্তারকৃত রফিকুল ইসলামকে ডেকে আনে এবং গ্রেপ্তারকৃত রফিকুল রুমে প্রবেশ করে ভিকটিমকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে। পরবর্তীতে গ্রেপ্তারকৃত নারী খেলোয়াড় রুমে প্রবেশ করে মোবাইল ফোনে ভিকটিমের নগ্ন ছবি ধারণ করে এবং কাউকে জানালে ভিকটিমের নগ্ন ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়ার হুমকি প্রদান করে। উক্ত ঘটনার পর গ্রেপ্তারকৃত রফিকুল ইসলাম ভিকটিমের নগ্ন ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে রাজধানীর একটি ফ্ল্যাটে নিয়ে একাধিকবার জোরপূর্বক ধর্ষণ করেছে বলে জানায়। উক্ত ঘটনায় ভিকটিম মামলায় দায়ের করলে গ্রেপ্তারকৃতরা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর গ্রেপ্তার এড়াতে দেশের বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান পরিবর্তন করে আত্মগোপন করে এবং আত্মগোপনে থাকাকালীন অবস্থায় র্যাব কর্তৃক গ্রেপ্তার হয়। মামলার এজাহার নামীয় ২নং আসামি গ্রেপ্তারকৃত অপর নারী খেলোয়াড়কে ইতোমধ্যে রাজধানীর শেরে বাংলা নগর থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
শাস্তি চায় মানবাধিকার কমিশন-
বাংলাদেশ জুজুৎসু অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম নিউটনের বিরুদ্ধে ওঠা খেলোয়াড়দের ধর্ষণ ও জোর করে গর্ভপাত করানোর অভিযোগ আমলে নিয়েছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। তার বিরুদ্ধে মামলা ও শাস্তি হওয়া উচিত বলে মনে করে সাংবিধানিক এ প্রতিষ্ঠানটি। গত বৃহস্পতিবার কমিশনের উপপরিচালক এম রবিউল ইসলাম স্বাক্ষরিত সুয়োমোটো (স্বতঃপ্রণোদিত অভিযোগ) থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কুংফু-কারাতে শেখানোর ছলে মেয়েদের সম্ভ্রমহানি করেছেন বাংলাদেশ জুজুৎসু অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম নিউটন। এতে রাজি না হলে মেয়েদের মারধর করে অনৈতিক কাজে লিপ্ত হতে বাধ্য করেছেন। এমনকি অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীর গর্ভপাত করানোর মতো ভয়ংকর অভিযোগও পাওয়া গেছে তার বিরুদ্ধে। এসব অপকর্মের অসংখ্য প্রমাণ, আপত্তিকর ছবি এবং অডিও রেকর্ড পেয়েছে একটি বেসরকারি টেলিভিশন।
প্রতিবেদন পর্যালোচনায় জানা যায়, অ্যাসোসিয়েশনের অধিকাংশ ট্রেইনি নারী। আর এই নারী খেলোয়াড়দের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলতেন নিউটন। এরপর ভালো চাকরি ও বিদেশে খেলতে নিয়ে যাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ এবং শারীরিক নির্যাতনের মতো অপকর্ম করতেন অভিযুক্ত নিউটন।
এমনকি অনুশীলনের আগে মেয়েদের পোশাক পরিবর্তনের কক্ষে ধর্ষণের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগ আছে, স্বর্ণজয়ী ক্রীড়াবিদসহ একাধিক নারী খেলোয়াড়কে ধর্ষণ ও শারীরিক নির্যাতনের মতো ঘৃণিত অপরাধে জড়িত তিনি। জুজুৎসুর আরেক নারী খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধে নিউটনকে সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে।
মানবাধিকার কমিশনের সুয়োমোটোতে উল্লেখ রয়েছে, ক্রীড়াসহ সব ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ যখন বৃদ্ধি পাচ্ছে তখন ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারীর সম্ভ্রমহানী, ধর্ষণ, শারীরিক নির্যাতনসহ অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীর গর্ভপাত করানোর মতো যে অভিযোগ বাংলাদেশ জুজুৎসু অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম নিউটনের বিরুদ্ধে উঠেছে তা অত্যন্ত ঘৃণিত ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। কমিশন মনে করে, অভিযোগের বিষয়ে সঠিক তদন্তপূর্বক বিভাগীয় শাস্তির পাশাপাশি যথাযথ আইনে মামলা হওয়া আবশ্যক।
কমিশন বলছে, এ অবস্থায়, অভিযোগের বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করে কমিশনে প্রতিবেদন পাঠানোর জন্য সচিব, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়কে বলা হয়েছে। আগামী ১২ জুন প্রতিবেদনের জন্য ধার্য করা হয়েছে।
মন্তব্য করুন