কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২০ এপ্রিল, ২০২৪, ০৭:৩১ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

দখল-দূষণে অস্তিত্ব সংকটে নরসুন্দা নদী!

ছবি: রূপালী বাংলাদেশ

কিশোরগঞ্জের জেলার উপর দিয়ে প্রবাহমান এক সময়ের খর স্রোতা নরসুন্দা নদী ময়লা আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। এর উপর ভূমি খেকো মানুষের দখলে ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে নদীটি। ১১০ কোটি টাকা ব্যায়ে 'কিশোরগঞ্জ নরসুন্দা নদী খনন ও পৌরসভা এলাকা উন্নয়ন প্রকল্প' ২০১২ সালের ২২ নভেম্বর উদ্বোধন করেন তৎকালীন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী প্রয়াত সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। নদী খনন করে লেকে পরিণত করা হলেও অবস্থার উন্নতি হয় নি। নরসুন্দা নদী প্রকল্পে অনেক লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে এবং খননের পর নদীটি ময়লা আর কচুরিপানার ভাগাড়ে রুপ নিয়েছে।

এছাড়াও নদীর পাড় সংলগ্ন অনেক জমি প্রভাবশালীরা অবৈধভাবে দখল করে নিয়েছে।স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ (এলজিইডি) ও কিশোরগঞ্জ পৌরসভা যৌথ উদ্যোগে নদী খনন প্রকপ্লের কাজ টি করে। প্রকল্পের কাজ টি সমাপ্ত হয় ২০১৬ সালে। নরসুন্দা নদী খননের পর পানির প্রবাহ না থাকায় কচুরিপানা ও ময়লা আবর্জনায় ভরপুর। যার ফলে নদীটি নাব্যতা হারিয়ে ময়লা আর আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। স্রোত না থাকায় নদীর পচা দুর্গন্ধ যুক্ত পানি থেকে রোগজীবাণু ছড়াচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে নরসুন্দার শুরু। প্রায় ৬৭ কিলোমিটার বয়ে যাওয়ার পর এটি ইটনায় ধনু নদীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, কচুরিপানা পচে নদীর পানি কালো বর্ণ ধারণ করেছে, সেখান থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। কোথাও কোথাও তা ময়লা আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। দখল হয়ে আছে পাড়সহ মাঝ নদীও। জেগে ওঠা ছোট ছোট চরে অনেকে ফসল চাষ করছেন। সিএস এবং এস এ (আর ও আর) জরিপে নরসুন্দা নদীর আকার বা পরিধি বড় ছিল কিন্তু আর এস জরিপের সময় নদীর উপর অস্থায়ী দখলদারকে মালিক হিসেবে ভূমি মন্ত্রনালয় দেখানোর ফলে তারা মালিক হয়ে নদীর বুকে বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি করেছে।

এ ছাড়াও কিশোরগঞ্জ শহরে প্রবাহিত নরসুন্দা নদী পাড়ের মানুষজন নদীর জায়গা দখল করেছে। শহরের বাইরে আর এস রেকর্ডের মালিকের বলে নদীর উপর বিভিন্ন স্থাপনা করে নদীর আকার ছোট করে সংকীর্ণ খালে বা নালায় পরিনত করেছে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নদীর পাড়ের প্রায় ৮২ শতাংশ জায়গা দখল করে আছেন ৪১ জন। তবে স্থানীয় পরিবেশকর্মীরা বলছেন, দখলদারের সংখ্যা কমপক্ষে ৪০০ জন হবে।প্রকৃতির দান এই নদী থেকে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ এবং নাব্যতা ফিরিয়ে না দিতে পারলে এক সময় নদী বলে কিছুই থাকবে না এবং ইকোসিন্টেমের ব্যপক ক্ষতি হবে।

শিক্ষাবিদ ও প্রগতিশীল ব্যক্তি আলফাজ উদ্দিন দিপু বলেন, মিয়ম্রান নদীগুলোকে খননের মাধ্যমে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব প্রাণ ফিরিয়ে দিতে হবে না হলে ইকোসিস্টেমের ক্ষতি হবে।নদীগুলোর নাব্যতা ফিরিয়ে না দিলে বাস্তুতান্ত্রিক বিপর্যয় হবে। ইতিমধ্যেই জলবায়ূ পরিবর্তনের কারনে আমাদের কৃষি ব্যবস্থা সমূহ ক্ষতি হতে শুরু করেছে। ভবিষ্যতে এর মাত্রা আরো বাড়বে।

নদী বিষয়ক জার্নাল রিভার বাংলার সম্পাদক, নদী গবেষক ফয়সাল আহমেদ বলেন, নরসুন্ধা নদীকে ঘিরে প্রথমত কোটি টাকার প্রকল্পটা যথাযথ বাস্তবায়ন হয় নাই।এতে দূর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। নদী কোন দিন সরল রেখায় বহমান থাকে না। নদীপাড় পাকা বাধাঁয় করার কারনে নদী পাড়ের মানুষজন নদীর জায়গা দখল করেছে। এতে নদীর আকার ছোট হয়েছে এবং নদীকে মানুষের ইচ্ছায় সরল রেখায় বহমান করেছে কিছু কিছু জায়গায়। নরসুন্দা নদীর সাথে ব্রহ্মপুত্রের সংযোগ স্থলে বাধঁ দেয়ার কারনে নরসুন্দা নদীতে পানি প্রবাহ নেই। যদি থাকতো তাহলে এ শুকনো মৌসূমেও পানি থাকতো নদীর বুকে এবং জীববৈচিত্র সুরক্ষিত থাকতো।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন বাপা'র কিশোরগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম জুয়েল বলেন, নরসুন্দা নদীর সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করছে কাওনার বাঁধ।এর কারণে নদীর প্রবাহ হারিয়েছে। কিছু এলাকায় তা জীবিত ছিল, তা-ও এখন মানুষের পুরোপুরি দখলে চলে গেছে। বিশেষ করে ময়লা-আবর্জনা নদীতে ফেলছে। নদীর উৎসমুখ থেকে পতিত হওয়া পর্যন্ত অংশ ৪০০ থেকে ৫০০ জন দখল করে নিয়েছেন।এমনকি জমির রেকর্ডও পরিবর্তন করে ফেলছেন।

এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মতিউর রহমান জানান, নরসুন্দা নদীর পানি প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।বাস্তবায়ন হলে নদীটি আগের রুপ ফিরে পাবে।

মন্তব্য করুন